শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ , ২৩ সফর ১৪৪৮

দেশ

অতিবৃষ্টির ধাক্কা সবজির বাজারে, তিন গুণ চিচিঙ্গা, দ্বিগুণ কাঁচামরিচের দাম

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি ১৫ জুলাই, ২০২৬, ১৮:৪৬:১৫

170
  • অতিবৃষ্টির ধাক্কা সবজির বাজারে, তিন গুণ চিচিঙ্গা, দ্বিগুণ কাঁচামরিচের দাম

কিশোরগঞ্জ: মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের বাজারে পাল্টে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দামের চিত্র। টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাবে চিচিঙ্গার দাম তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে এবং কাঁচামরিচের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া বেগুন, পটল, ঝিঙা, করলা, ভেন্ডিসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।

বুধবার  (১৫ জুলাই) কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার, কাচারি বাজার, পুরান থানার বাজার ও আড়ত ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাঠ থেকে সময়মতো সবজি তুলতে পারছেন না। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় উৎপাদিত সবজি নষ্ট হচ্ছে। আবার যেসব সবজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে, সেগুলো পরিবহণেও দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা। ফলে পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও বেড়েছে দাম।

 

এক সপ্তাহে কোন পণ্যের দাম কত বেড়েছে

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চিচিঙ্গা ও কাঁচামরিচের দাম। বাজারের তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়, যার আগের বা অন্য একটি দাম ছিল ৬০-৮০ টাকা। চিচিঙ্গার দাম ২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকায়। একইভাবে, পূর্বে ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া বেগুন এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। পটল ৩০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ টাকায়। এছাড়া, ঝিঙার দাম ৫০-৬০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ টাকা এবং করলার দাম ৬০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকায়। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি সবজির দামই আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি সবজির দামই আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী এমদাদুল হক বলেন, "খামার ও ক্ষেত থেকেই সরবরাহ কমে গেছে। তাই পাইকারি বাজারে আগের চেয়ে বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। সেই প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে।"তিনি জানান, আগে যে বেগুন ৩৫-৪০ টাকায় কিনতেন, এখন তা কিনতে হচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়। এছাড়া ভেন্ডি ২৫-৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০ টাকা, পটল ১২-১৩ টাকা থেকে ২০-২২ টাকা, উস্তা ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, দুন্দুল ৮-১০ টাকা থেকে ২৪-২৫ টাকা, ঝিঙা ২৫-৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ২০-২৫ টাকা থেকে ৩০-৪০ টাকা এবং কাকরোল ২০-২৫ টাকা থেকে ৩২-৩৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আর ভারতীয় টমেটো বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০০ টাকা কেজি দরে।

শহরের বড় বাজারের সবজি বিক্রেতা সাইদুর রহমান বলেন, “বৃষ্টির কারণে ক্ষেত থেকে সবজি তোলা যাচ্ছে না। যে পরিমাণ সবজি বাজারে আসার কথা, তার অর্ধেকও আসছে না। সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিনই দাম বাড়ছে।”

আরেক বিক্রেতা আল-আমিন বলেন, “সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে কাঁচামরিচের। আগে ৬০-৭০ টাকা কেজি দামের মরিচ এখন ১২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”

বিক্রেতা সুমন বলেন, “আগে ৬০ টাকার পণ্য এখন ১০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাও কমে গেছে। অনেকে প্রয়োজনের তুলনায় কম সবজি কিনে চলে যাচ্ছেন।”

‘এক সপ্তাহেই বাজার খরচ বেড়েছে’

কিশোরগঞ্জ শহরের বাসিন্দা আবদুল মান্নান বাজার করতে এসে বলেন, “গত সপ্তাহেও যে কাঁচামরিচ ৮০ টাকায় কিনেছি, আজ সেটি ১২০ টাকা। প্রায় সব সবজির দাম বেড়েছে। একই টাকায় এখন আগের মতো বাজার করা যাচ্ছে না।”

বাজারে আসা গৃহিণী ফারজানা খাতুনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যেখানে এক হাজার টাকায় সপ্তাহের সবজি কেনা যেত, এখন একই পরিমাণ সবজি কিনতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। ফলে সংসারের মাসিক বাজেটে অতিরিক্ত চাপ।

শুধু সবজিই নয়, ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়েছে। মুরগি বিক্রেতা মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বলেন, “গত এক সপ্তাহে ব্রয়লারের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় উঠেছে। তবে সোনালি মুরগির দাম এখনও ৩০০ টাকাই রয়েছে।”

অন্যদিকে গরুর মাংসের বাজারে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। বিক্রেতা মোহাম্মদ ইয়াসিন জানান, পাইকারিতে প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৮০০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী গ্রামের সবজিচাষি সাদ্দাম হোসেন রুবেল বলেন, “টানা বৃষ্টিতে আমার প্রায় ১৫ শতাংশ জমির সবজি পানি জমে নষ্ট হয়ে গেছে। আমার মতো এলাকার সবারই সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে দাম বাড়লেও কৃষক সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। কারণ ক্ষেত থেকে সবজি বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে অতিরিক্ত পরিবহণ ও শ্রমিক খরচ গুনতে হচ্ছে, অথচ পাইকারি বাজারে দাম তুলনামূলক কম।”

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, চলতি মাসের ৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১০২ হেক্টর জমির শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৭৬০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে কৃষি বিভাগের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।

তিনি আরও জানান, কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে অনেক এলাকায় সবজিক্ষেত পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে উৎপাদন কমেছে, পাশাপাশি মাঠ থেকে সবজি সংগ্রহ ও পরিবহণ ব্যাহত হচ্ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম বাড়ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। কৃষিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে বৃষ্টি অব্যহত থাকলে বাজারে অস্থিরতা আরও কিছুদিন থাকতে পারে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়ার ওপরই নির্ভর করছে সবজির বাজার। বৃষ্টি কমে কৃষকরা নিয়মিতভাবে ক্ষেত থেকে সবজি তুলতে পারলে সরবরাহ বাড়বে এবং দামও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ, যাদের প্রতিদিনের বাজার খরচ এখন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

নিউজজি/নাসি

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2023 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers