বুধবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, , ৬ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

সাহিত্য
  >
গল্প

‘এখন প্রায় সবাই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে লিখছেন’

 নভেম্বর ১৮, ২০১৭, ১৯:১৩:০৬

  • ছবি- মীর ইসলাম

‘রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে মামলা এবং বিবিধ গল্প’-এর জন্য এবার জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন সৃজনশীল কবি ও গল্পকার আশরাফ জুয়েল। তাৎপর্যবহ এ পুরস্কার প্রাপ্তি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে নিউজজি২৪ডটকম-এর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। জানাচ্ছেন ফারুক হোসেন শিহাব।

জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তিকে কীভাবে উপভোগ করছেন?

এটি অনেক আনন্দের এবং ভালো লাগার বিষয়। পুরস্কার-সম্মাননা তো আসলে দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে এটুকু বুঝি যে, আরো লিখতে হবে, দায়িত্বের সাথে সামনের দিনগুলো চলতে হবে।

এ ধরনের পুরস্কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের জন্য কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক বলে মনে করেন?

প্রথমত, এ ধরনের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে যে একজন কবি বা লেখকের লেখা হঠাৎ করে নতুন মাত্রা পাবে কিংবা অনেক পরিবর্তন চলে আসবে তা কিন্তু নয়। তবে তরুণদের জন্য এ ধরনের স্বীকৃতি অবশ্যই উৎসাহমূলক। তাদের পথচলায় এসব কর্মতৎপরতা অনন্য ভূমিকা রাখে।

কী ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনি এ পুরস্কারে ভূষিত হলেন?

চার মাস আগে আয়োজকদের পক্ষ থেকে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হয়েছিল। যার প্রেক্ষিতে আমিও পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলাম। পুরস্কার ঘোষণার একদিন আগে অফিশিয়ালি আমাকে ফোন করে জানানো হয়েছে যে, জুরিবোর্ড আমার পাণ্ডুলিপি পুরস্কারের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত করেছে। 

‘রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে মামলা এবং বিবিধ গল্প’ লেখার প্রেক্ষাপটটা কেমন ছিল?

ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় আমার গল্প বেড়ে উঠে। ‘রাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে মামলা এবং বিবিধ গল্প’ লেখার একটা নির্দিষ্ট কাল বা সময় আছে। ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারির কথা। পরের দিন আমার ছোট সন্তানের একটা জটিল অপারেশন। এ কথা শুনে আমার মা-বাবা রাতের বাসে ঢাকার উদ্দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রওনা হলেন। রাজশাহীর ভদ্রা নামক স্থানে তাদেরসহ অন্যান্য যাত্রীদের উদ্দেশে পেট্রল বোমা ছুঁড়ে মারা হলো। বিরোধী রাজনৈতিক জোটের ডাকা লাগাতার হরতালে সারাদেশেই এই অরাজকতা, মানুষ শঙ্কিত।

মাকে হাসপাতালে নেয়া হয়, পরের দিন আগুনে পুড়ে যাওয়া তার মুখের ছবি প্রকাশ পায় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। অনেক দুঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করে প্রায় ২১ দিন পর মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু মামলা করতে পারিনি। আমার সমস্ত আক্রোশ গিয়ে পড়ে রাষ্ট্র ধারণার ওপর। আমি লেখা আরম্ভ করি। আমার এই বিশ্বাস জন্মায়- ‘রাষ্ট্র ধারণা’ একটা ভ্রান্ত ধারণা। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করি- রাষ্ট্র আসলে মানুষকে শোষণের একটা হাতিয়ার। বরং দেশ ভাবনা আমাকে প্রশান্তি দেয়- ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’

সাহিত্যচর্চার বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে দেখছেন?

আসলে, সাহিত্য সবসময় সত্য, ন্যায় ও নৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সৌচ্চার। ৫২, ৭১-সহ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে আমার মনে হয় না, সমকালীন যারা লিখছেন তাদের লেখায় সেই চেতনা পুরোপুরি রয়েছে। অর্থাৎ যেকোনো সংকটে একজন লেখক তার নৈতিক দায়িত্ব থেকে প্রয়োজনে নিজেকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে লিখছেন; এমনটি সচরাচর দেখা মিলে না। এখন প্রায় সবাই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে লিখছেন। অর্থাৎ আমাদের কবি সাহিত্যিকরা অনেকটাই কম্প্রোমাইজ করে লিখছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আসলে ‘মহান সাহিত্য’ খুব একটা হয়ে ওঠে না। 

বাংলাদেশে চলছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ সাহিত্যাসর ‘লিট ফেস্ট’। অপরদিকে, কলকাতায় চলছে ‘বাংলাদেশ বইমেলা’। একজন তরুণ কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে দুই বাংলার সাহিত্যচর্চার পার্থক্যকে কীভাবে দেখছেন?

দুই বাংলাতেই ক্রমাগত সাহিত্যচর্চা প্রসারিত হচ্ছে। তবে বাংলা ভাষাভাষী সাহিত্যচর্চার কেন্দ্রটা কিন্তু ঢাকামুখী। কারণ বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের প্রেম ও ত্যাগটা একেবারেই আলাদা। একসময় আমাদের লেখকরা কলকাতায় যেতেন। সেখানে তাদের কোনো লেখা বা বই প্রকাশ পেলে তারা খুবই উৎসাহবোধ করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কলকাতার বহু লেখক আমাদের একুশে বইমেলায় আসেন এবং তাদের বইও এখানে প্রকাশ পাচ্ছে। তারা লেখা নিয়েই আসেন বা আমাদের ভাষার প্রতি ভালোবাসা নিয়েই আসেন, আসছেন কিন্তু। সে অর্থে স্রোতটা কিন্তু বাংলাদেশমুখী। 

বইমেলার পাশাপাশি লিট ফেস্টের মতো সাহিত্যাসর কবি-সাহিত্যিকদের জন্য কতটা জরুরি বলে মনে করেন?

বইমেলার একটি অনন্য-অসাধারণ ব্যাপার। পৃথিবীর কোনো দেশে এত লম্বাসময় ধরে এত জাকজমকপূর্ণ বইমেলা সাধারণত হয় না। পাশাপাশি লিট ফেস্টের মতো আয়োজনও কিন্তু আরো বেশি বেশি হওয়া উচিত। কেননা এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আমাদের একটা মেলবন্ধন এবং জানাশোনা হয়ে ওঠে। সমকালীন নানা বিষয়ে আমরা পারস্পরিক ভাবনা আদান-প্রদান করতে পারি। তাছাড়া এখনকার তরুণদের বেশিরভাগই মোবাইল ডিভাইসের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত কিংবা তারা অন্ধকার পথ বেছে নিচ্ছে।

সেই দিক থেকে এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা তাদের আলোর পথে নিয়ে আসতে পারি। তবে, লিট ফেস্টের মূল বিষয়টা আমার কাছে মনে হয়- সমকালীন বিদেশি লেখকদের লেখার সাথে আমরা যেমনি পরিচিত হচ্ছি, একইভাবে আমাদের লেখার সাথে তাদেরও পরিচয় ঘটছে। এতে করে চিন্তার পার্থক্যটা বোঝা যায়। সার্বিক অর্থে আমাদের তরুণরা অনেক ভালো লিখছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এর তেমন একটা প্রচার নেই। এ ধরনের আয়োজন সেই প্রচারের জন্যও সহায়ক।

নিউজজি/এসএফ/এমকে

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers