সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৮, , ৪ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

সাহিত্য
  >
কবিতা

গ্রামীণ জীবনধারার শাশ্বত কবি জসীমউদ্‌দীন

ফারুক হোসেন শিহাব জানুয়ারি ১, ২০১৮, ১২:১৫:৩৯

  • গ্রামীণ জীবনধারার শাশ্বত কবি জসীমউদ্‌দীন

পল্লির অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা নিপীড়িত-নিগৃহীত মানুষের জীবনকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে পল্লীকবি জসীমউদ্‌দীনের কাব্যভুবন। বাংলা সাহিত্যে কবি জসীমউদ্দীনই প্রথম কবিতা, গল্প, গান কিংবা নাটকে পল্লিবাংলার জীবনকে চিত্রিত করেছেন। তিনি গ্রামের শোষিত-অবহেলিত সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অসাধারণ কথাগুলো তুলে এনেছেন তার অনবদ্য কাভ্যধারায়।

রাখালিয়া সুর আর কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের বাস্তবচিত্র রূপায়ণে জসীমউদ্‌দীন খুব সহজভাবে তুলে এনেছেন গ্রামীণ জনপদের কিষাণ-কিষাণী, যুবক-যুবতীদের জীবন-জীবিকা আর প্রেম উপাখ্যানের কাহিনি। যাদের অবলম্বন করে তিনি তার কবিতা নির্মাণ করেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছে রাখাল। সাহিত্যের অনুষঙ্গ হিসেবে বাঙালি হিন্দুর রামায়ণ-মহাভারতের কথক ঠাকুরের ধারা আর কারবালা কাহিনির জারিগান ও বাউল সাধনার ধারাকে ধারণ করেছেন তিনি।

আজ ১লা জানুয়ারি ২০১৮ পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ১১৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯০৩ সালের এই দিনে তিনি ফরিদপুর জেলার আম্বরখানা গ্রামে জন্মগহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই কবি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তিনি ফরিদপুর ওয়েলফেয়ার স্কুল ও ফরিদপুর জেলা স্কুলে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং এরপর এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন।

পেশাগত জীবনে তিনি ১৯৩১ সালে দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে লোকসাহিত্য সংগ্রহ কাজে চাকরি করেন। ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৪ সালে সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে রবীন্দ্র বিশ্ব ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সন্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রী প্রদান করে।

বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের কীর্তিমান এই কবি পল্লীর জনগণের আনন্দ-বেদনা এবং তাদের জীবনধারার ওপর চিরায়ত রচনাসম্ভারের মাধ্যমে পল্লী কবি হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। কবি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখনই তার বিখ্যাত ‘কবর’ কবিতা বাংলা পাঠ্য বইয়ে স্থান পায়। জসীমউদ্‌দীনের সাধনায় খুলে গেছে বাংলা কবিতার নতুন এক দার। কবি যখন কলেজে লেখাপড়া করতেন, তখন লিখলেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিতা ‘কবর’। এ কবিতাটি কবিকে খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেয়। মৃত্যুর পটভূমিতে সাংসারিক প্রেমের এক করুণ রূপ বর্ণিত হয়েছে ‘কবর’ কবিতায়। স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পরিজনহারা শোকে আচ্ছন্ন এক বৃদ্ধ নাতিকে নিয়ে স্ত্রীর কবর নির্দেশ করে বলেছেন –

‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,

ত্রিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’

জসীমউদ্‌দীন বাংলা কবিতায় একটি আলাদা রীতির প্রবর্তন করেছেন। বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখের প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই জসীমউদ্‌দীনের এইসব কবিতায়। আসমানী নামের একটি অভাগী–অনাহারী মেয়ের জীবনের করুণ কাহিনি নিয়ে তিনি লিখলেন-

‘আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,

রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ড. দীনেশচন্দ্র সেন জসীমউদ্‌দীনের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছেন। তার ‘কবর’ কবিতা পড়ে কেঁদেছেন ড. দীনেশচন্দ্র সেনও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জসীমউদ্‌দীনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন ‘ যে আছে মাটির কাছাকাছি, আমি সে কবির জন্য কান পেতে আছি’। 

ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সাথে ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসাহিত্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কবি সেখানকার প্রতিটি পল্লিগ্রামে অবস্থান করেন। এ প্রসঙ্গে কবি বলেছেন, লোকসাহিত্যকে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসুবিধা আছে। প্রায়শই এটা মধ্যবিত্ত শ্রেণির রুচির সাথে মেলে না। তাই আমি কখনো একগুচ্ছ গান সংগ্রহ করে তার মধ্যে যেগুলো শহরের রচনার লোকদের রুচির সাথে খাপ খায় সেগুলোই বেছে নিতাম। গ্রাম্যসাহিত্য থেকে অশ্লীল বা আপত্তিকর অংশ কেটে বাদ দিয়ে আমি তাকে ভদ্র সমাজের উপযোগী করে তুলতাম। এছাড়া তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান।

তার লেখা জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- আমার সোনার ময়না পাখি, আমার গলার হার খুলে নে, আমার হাড়কালা করলাম রে, আমায় ভাসাইলি রে, আমায় এত রাতে, কেমন তোমার মাতা পিতা, নদীর কূল নাই কিনার নাই রে, ও বন্ধু রঙিলা, রঙিলা নায়ের মাঝি, ও আমার দরদী আগে জানলে, প্রাণ সখিরে ওই কদম্ব তলে বংশি বাজায় কে প্রভৃতি। তার বেশ কয়েকটি নাটকও বাংলা নাটকের ভিড়ে অমর রচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। লিখেছেন উপন্যাস ও ভ্রমণ কাহিনি।

গান, গল্প, কবিতার মতো জসীমউদ্‌দীনের নাটকের ভাষা নরম, সহজ এবং প্রাঞ্জল। নাটকের মধ্যে রয়েছে- পদ্মাপার, বেদের মেয়ে, মধুমালা, পল্লীবধূ, গ্রামের মেয়ে, ওগো পুষ্পধনু ও আসমান সিংহ। আত্মকথা- যাদের দেখেছি, ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়, জীবনকথা ও স্মৃতিপট।

জসীমউদ্‌দীন কাব্যগ্রন্থ, নাটক, উপন্যাস, কাব্যোপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ, লোক-সাহিত্য, গবেষণাগ্রন্থ, গানের বই, ভ্রমণকাহিনি এবং নিজের আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথাসহ অর্ধশতের অধিক বইয়ের রচয়িতা। তাঁর অনেক গ্রন্থই বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কবির ‘মাটির কান্না’, কাব্যগ্রন্থটি রুশ ভাষায় একটি সংস্করণ বেরিয়েছে।

কবির কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে রাখালী (১৯২৭), নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯), বালুচর (১৯৩০), ধানক্ষেত (১৯৩৩), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪), হাসু (১৯৩৮), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫), রূপবতী, মাটির কান্না, এক পয়সার বাঁশী, সকিনা, সুচয়নী, ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে, হলুদ বরণী, জলে লেখন, কাফনের মিছিল ও কবর। এ ছাড়াও তার চারটি উপন্যাস, চারটি ভ্রমণ কাহিনী, দুটি গানের বই রয়েছে।

কবি একুশে পদক (১৯৭৬), স্বাধীনতা পদক (১৯৭৮), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

 

নিউজজি/এসএফ

 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers