বুধবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, , ৬ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

সাহিত্য
  >
কবিতা

অপ্রিয় পত্র

জোছনা হক মার্চ ১৭, ২০১৭, ১৪:৩৯:৪১

  • অপ্রিয় পত্র

সাড়ে তিন হাজার লাল গোলাপের সয্যায় অজগরের বিষাক্ত ছোবলে আমাকে মারতে ছেয়েছিলে,

বরং অজগর প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল আমার কারুকাজ করা খোঁপায়।

টোস্টার ইলেকট্রনিক ওভেনে জাপানিজ লাজানিয়া খাবারের প্রবণতা জাগলো তোমার, বিচ্ছিন্ন করে দিলে অটো-সিস্টেম, চম্বুকের ন্যায় চুষে নিলো আমার যতসব রক্ত, তবু আমার মরণ হয়নি।

নৌকাভ্রমণে নদীর মাঝখানে উথাল-পাতাল ঢেউয়ের তালে ভালোবাসার নাম করে জড়িয়ে ধরে দিলে এক ধাক্কা,

আমিও সাঁতার কাটি ঢেউয়ের তালে তুমি কী জানতে আমি বেঁচে যাব।

রেস্তোঁরায় যতসব দামী খাবারে মিশিয়ে দিলে বিষ,

বিষের বদলে আমার হয়ে গেল বদহজম,

বিষ ও আমার শরীরে স্যুট করেনি।

হায়রে মরণ!

পাহাড়কুলে জন্ম আমার,

গায়ের রঙ কালোজামের মতো মিশমিশে,

গড়ন নাকি দেখতে বেশ!

হলুদ রঙের লাল পাইলের শাড়ি পরলে আমাকে দেখাতো ভালো,

মা আমার কৃষাণী, বাবা আমার দিনমজুর,

বাবার স্বভাবের মধ্যে সব ভালো, দোষের মধ্যে একটা দোষ তার,

সন্ধ্যা হলে বাবাকে টানতো আমাদের পাহাড়কুলের নিমতলীর মদ।

মদের ঘোরে বাবা আমার ঘরে ফিরে মায়ের চুলের মুটি ধরে দিলো এমন মার,

আমি কোনোরকম ধরতে গেলে,

দূর হবি পোড়ামুখী,

মেয়ে হয়ে জন্ম নিলি, তোর মরণ হয় না কেন?

আমি বুজি বাবার দুঃখ, 

গরিবের ঘরে মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটা যে কী অভিশাপ!

পড়া-লেখা, কাপড়-চোপড়, সাজন-গুজন, বিয়ের জোড়া, যৌতুক।

উফ্, কত ঝামেলা। 

আমি মেয়ে মানুষ, মেয়ে মানুষের মরণ নেই।

খেলতে গিয়ে কতবার ভেসে গেছি,

পাহাড় ঘেঁষে পড়ে গেছি,

আমার বাঁচন দেখে পাড়াপড়শি বলে,

মেয়ে মানুষের মরণ নেই ছেলে হলে কি বাঁচতো?

সেদিন ঘোড়াতে চাপিয়ে পাখি শিকারে যখন আসলে,

তোমার চোখের সামনে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বাবা আমাকে তুলে দিচ্ছে নিমতলীর মদখোর মফিজ বেপারীর হাতে।

মদের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় বাবা আমায় বিক্রি করে দিচ্ছে,

রাগে লাঠি নিয়ে বেপারীর মাথা দিলাম ফাটিয়ে,

উদ্ধার করলে আমায়,

সবার সামনে কবুল করে নিয়ে এলে তোমাদের বহু বিলাসী অট্টালিকায়।

পাহাড়কুলের কালোজামের মতো মিশমিশে মেয়েটিকে শেখাতে লাগলে খাবারের নাম, শুদ্ধভাষা, রুপচর্চা।

বড় লোকদের কত কী এখানে না আসলে বুঝতেই পারতাম না।

আমাকে নিয়ে শুরু হয়ে গেল তোমাদের সমাজের যতসব সেমিনার, সভা, মিটিং।

কে জানতো! তোমাদের সমাজে আমাদের মতো মেয়েদের নিয়ে এইসব অজুহাতমাত্র।

আর টিভিওয়ালা, কাগজওয়ালারা তো আছে, তোমাদের কেনা গোলাম।

পুরো দেশটাই তো তোমাদের দখলে।

এতকিছু করলে আমার সাথে, আমি নালিশ করব না,

করব বা কার কাছে!

সব তো তোমাদের, নেতা-নেত্রী, মন্ত্রী, পুলিশ, থানা সব তোমাদের দখলে।

দেশটা যে কোন দিকে যাচ্ছে আমার জেনে রাখা দরকার।

শুধু তোমাদের মতো মানুষ না!

তবে, এখনো মানুষের মতো মানুষ আছে,

ভাবিও না নারীরা যে তোমাদের চরণতলার দাসী হয়ে থাকবে,

তোমাদের হাত অতো লম্বা না যে, যেমন ইচ্ছে করবে।

ওরাও বাঁচতে জানে, নিজেকে রক্ষা করতে জানে।

তবে, আমার একদিন মরণ হবে!

অজগর সাপের ছোবলে, ইলেকট্রিক, নদীতে ধাক্কায়, খাবারে মিশানো বিষে নয়,

হয়তো লাজুকলতার ছোট কাঁটার আঘাতে, নয়-তোবা কোনো গোলাপের কাঁটার আঘাতে।

গরিবের মৃত্যু বড় লোকদের মাস্টার প্ল্যানে সহজে সার্থক হয় না।

খুব শক্ত ওদের প্রাণ।

নিউজজি/এসএফ/ এমকে

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers