সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৮, , ৪ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

ফিচার

সবুজের সংসার ভালো থাকুক

লুৎফর হাসান জানুয়ারী ১৩, ২০১৮, ১১:৪৯:২৬

  • সবুজের সংসার ভালো থাকুক

আমাদের নবগ্রামে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। কালীমন্দিরের পাশে। স্কুলঘরের উত্তরে। পোস্ট অফিসের মাথায়। বটগাছের ছায়া ছিল ঝিনাই নদীর অর্ধেকটা জুড়ে। সবে সাঁতার শিখেছি আমরা। চৌদ্দ ভাগা পুকুরের সাঁতার পর্ব শেষে আমরা তখন ঝিনাইর বুকে। আমাদের গ্রামটা কয়েকশ বছরের পুরনো এক গ্রাম। পুরো গ্রামে যত গাছ ছিল তার অধিকাংশই অনেক বড় বড়। সব গাছের চেয়ে বটগাছটা ছিল একেবারেই আলাদা। অনেক বড় এক বকুল গাছ ছিল কাছেই। সেটা স্কুলের উঠোনে। কিন্তু বটগাছের তুলনায় অবুঝ শিশুর মতো লাগতো তাকে।

সেই বটগাছের তলায় পূজোর সময় মেলা বসতো। ডালে ডালে লাল কাপড় বেঁধে দিত সবাই। কী যে রঙিন লাগতো তাকে। বটগাছের বুকের মধ্য থেকে লম্বা লম্বা শেকড় ঝুলে এসে থাকতো ঝিনাই পর্যন্ত। সেই শেকড়কে আমরা বটগাছের দাড়ি বলে জানতাম। দাড়ি ধরে রাখতাম শক্ত করে। দোলনার মতো করে কেউ আমাদের ধরে উড়িয়ে দিতো নদীর দিকে। নদীর সীমানায় গিয়ে আমরা হাত ছেড়ে দিতাম। ঝপ করে পড়ে যেতাম জলের মধ্যে। তারপর সাঁতরে এসে ফের পারে এসে থামতাম।

একদিন শহর থেকে সাদা জুতো পায়ে কজন লোক এলো। কী সব যেন মেপে গেলো তারা। তারপর একদিন এলো দাঁতাল করাত। কুঠার কাঁধে কেউ কেউ। প্রথমে হাত কাটলো বটগাছের। তারপর পা ও মাথা। গোড়ায় করাত চালিয়ে পুরো গাছটাকে ফেলে দেয়া হলো নদীর মাঝখানে। শ্মশান ছিল নদীর ঘাটেই। সেই শ্মশান যেন সেদিন থেকে নিজের চেহারায় ফিরে এলো। একদিন মন্দিরও হারালো তার চেহারা। উঠে গেলো পোস্ট অফিস।

আমাদের সবুজ নবগ্রামে শহরের সভ্যতা ঢুকে গেলো। বড় সড়ক থেকে দেবদারুর জঙ্গলের একপাশ ঘেঁষে যে পথ ঢুকে গেছে আমাদের বাড়ির দিকে, সেদিকেও ছিল বড় বড় গাছ। কিছুই নেই সেসবের। কয়েকশ বছরের পুরনো জঙ্গল ছিল দিনের বেলাতেও কেমন ঘন অন্ধাকারে আচ্ছন্ন। এখন রাতের বেলাতেও সেসবের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। বড় পরিপাটি এক সবুজের সংসার ছিল নবগ্রাম। বৃক্ষ নিধনের নির্মমতায় সে গ্রামকে এখন উদোম লাগে খুব। বিবস্ত্র লাগে। গ্রামের দিকে গেলে আর ভালো লাগে না। মা বাবা ছাড়া ও গ্রামে তাই আর কিছু নেই। গাছেরা পরিবারের সদস্য। স্বজন লাগে গাছেদের। 

বছর পাঁচ আগে, কলকাতা যাচ্ছিলাম সড়কপথে। যেতে যেতে যশোর রোড। বেনাপোল হয়ে পেট্রোপোল ছাড়িয়ে উত্তর চব্বিশ পরগণার সেই পথের দু’ধারে প্রাচীন গাছেদের সারি। কী যে মায়া লেগে ছিল সেই পথে। জানালায় তাকিয়ে বুড়ো গাছেদের মমতার সংসার দেখতে দেখতে কত নস্টালজিয়া পেয়ে বসেছিল। খবরে পড়লাম, সবকটা গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। উপরের নির্দেশ। বড় সড়ক হবে, তাই বুড়ো গাছদের হত্যা করতে হবে। কে ঠেকায় তারে। কী করে সম্ভব এই মৃত্যুর মিছিল প্রতিরোধের?

সবুজের সাথে বৈরিতা শুরু হলে প্রকৃতি যে গোস্বা করে, এ কথা কে কাকে বোঝায় এই অবেলায়? কিছুই বলার নেই দুঃখ মেনে নেয়া ছাড়া। কিছুই বলার নেই সত্যিই।  

ছবি – ইন্টারনেট । 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers