সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৮, , ৪ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

ফিচার

গিনিপিগ

নিউজজি ডেস্ক জানুয়ারী ৭, ২০১৮, ১৭:৪৯:০০

  • গিনিপিগ

গিনিপিগ এর বৈজ্ঞানিক নাম Cavia porcellus. এদের উৎপত্তি হলো দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতে। আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে আন্দিজ অঞ্চলের আদিবাসীরা এদের পোষ মানায়। ইউরোপ থেকে আসা বণিকগণ এদের পরবর্তীতে ইউরোপে নিয়ে আসে ষোলোদিকে শতকের দিকে। এদের নামকরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এরা পিগ অর্থাৎ শুকুর এর সমগোত্রীয় নয় আবার এদের সাথে Guinea এরও কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও এদের নাম Guinea Pig হলো কেন এ নিয়ে অনেক মতবাদ প্রচলিত। ধারণা করা হয় যে, ইউরোপের বণিকগন দক্ষিণ আমেরিকাতে বাণিজ্য করার জন্য Guinea হয়ে আসতেন আর সেখানে এই সব প্রাণীরা বসবাস করত এবং এদের আকার অর্থাৎ দেহ ও মুখমণ্ডল দেখতে শুকুর এর মতো, তাই এই নামকরন। আর একটি জনপ্রিয় মতবাদ বলে যে তাদের মাত্র ১ গিনি দিয়ে কেনা যেত তাই এই নামকরন। কিন্তু গিনি ইংল্যাণ্ডে প্রচলিত হয় ১৬৬৩ সালে। কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, ওয়িলিয়াম হার্ভে তারও আগে অর্থাৎ ১৬৫৩ সালে Guinea Pig শব্দটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে এই প্রাণীরা তাদের শান্তশিষ্ট ব্যবহারের জন্য খুবই জনপ্রিয় পোষাপ্রাণী। গিনিপিগ ইংরেজিতে হল Guinea Pig; এর বৈজ্ঞানিক নাম Cavia porcellus । 

এরা ইঁদুরজাতীয় ছোট্ট স্তন্যপায়ী প্রাণী। ল্যাটিন ভাষায় ক্যাভিয়া পোর্সেলাস শব্দের অর্থ হচ্ছে ছোট্ট শূকরশাবক। কিন্তু গিনিপিগের সঙ্গে শূকরছানার কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি এটি গিনি থেকেও উদ্ভূত নয়। জৈবরসায়নবিদগণ গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, গিনিপিগের আদি বাসস্থান হচ্ছে আন্দেস পর্বতমালা। ক্যাভি প্রজাতির সঙ্গে এদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে এদের পরিচিতি রয়েছে। মূলত : এ কারণেই গিনিপিগকে বন্য পরিবেশে দেখা যায় না। 

জীববিজ্ঞানীরা সপ্তদশ শতক থেকে গিনিপিগের ওপর নানান রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। উনবিংশ এবং বিংশ শতকেও আদর্শ প্রাণী হিসেবে এর ওপর ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। পরবর্তীকালে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাকর্ম চালানো হয়। এখনো গিনিপিগের ওপর ব্যাপকভাবে গবেষণা করা হয় যা মানব চিকিৎসার লক্ষ্যে ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, স্কার্ভি ও গর্ভধারণবিষয়ক জটিলতা নিরসনজনিত। গিনিপিগ ইঁদুরের চেয়ে বড় আকৃতিবিশিষ্ট হয়ে থাকে। 

সংরক্ষণ অবস্থাঃ পোষ মানা বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস জাতঃ নানা জাতের গিনিপিগ রয়েছে সারা বিশ্বে। গিনিপিগের জাতগুলোর নাম ভীষণ সুন্দর। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পেরুভিয়ান, সিল্কি, আমেরিকান ক্রেস্টেড, রেক্স, টেডি, করনেল, ট্যাক্সেল ইত্যাদি। 

বৈশিষ্টঃ গিনিপিগরা সবচেয়ে বড় রোডেন্ট(ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী). এদের ওজন সাধারণত ৭০০ গ্রাম থেকে ১২০০ গ্রাম (১.৫-২.৫ পাউন্ড) পর্যন্ত হয়। দৈর্ঘ্য গড়পরতা ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার (৮-১০ ইঞ্চি) হয়। এদের গড় আয়ুষ্কাল ৪-৫ বছর। কিন্তু অনেক সময় আট বছরও হতে পারে। ২০০৬ গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডের তথ্য মতে, সবচেয়ে দীর্ঘজীবী গিনিপিগটি বেঁচে ছিল ১৪ বছর সাড়ে ১০ মাস। এরা সাধারণত ২-৫টি বাচ্চা প্রতি প্রজনন ঋতুতে দেয়। 

খাদ্যাভ্যাসঃ এরা সাধারনত তৃণভোজী প্রাণী। এদের প্রিয় খাবার হলোঃ- কুমড়া, পেপে, আঙ্গুর, জাম, লিচু, কলা, বাধাকপি, গাজর, মরিচ, তরমুজ প্রভূতি। তবে এদের খাবারে অবশ্যই প্রতিদিন ৩০mg ভিটামিন-সি আলাদাভাবে দিতে হবে। আবাসঃ এরা সাধারণত নীরব শান্ত পরিবেশে থাকতে পছন্দ করে, তাই এদের বাসার সব ধরনের কোলাহল থেকে দূরে রাখা নিরাপদ। অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী অর্থাৎ কুকুর, বেড়াল, খরগোশ প্রভূতি থেকে দূরে রাখা উচিত। এদের ঘর আর কমপক্ষে ৪ ঘনফুট হতে হবে।

পোষা প্রাণীঃ বিশ্বের অনেক দেশেই গিনিপিগকে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে লালন-পালন করা হয়। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়াসহ অন্যান্য দেশসমূহে খাবারের উদ্দেশ্যে বড় করা হয়। খাদ্যের আদর্শ যোগানদাতা হিসেবে কিছু অঞ্চলের লোকজনের ধারনা যে, গিনিপিগ অশুভ আত্মাকে দূরে সরিয়ে রাখতে সমর্থ। পেরুর কুইচুয়া এলাকার উপজাতিরা স্থানীয় ভাষায় এ প্রাণীকে কুইভি বলে। অন্যদিকে স্পেনীয়ভাষী লোকজন একে কাই নামে ডাকে। প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে পেরুর অধিবাসীরা কৃষিভিত্তিক জীবন ব্যবস্থায় এ প্রাণীকে লালন-পালন করতো। ইনকারা গিনিপিগ সংরক্ষণ করতো এবং একই সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভেনেজুয়েলা থেকে চিলির মধ্যভাগের উপজাতীয়রা পোষা প্রাণী হিসেবে গিনিপিগকে পোষ মানাত। এখনো তাদেরকে বাড়ীতে কিংবা বাইরে মুক্তভাবে জীবনধারনের উদ্দেশ্যে পালা হয়। ষোড়শ শতকে ইউরোপে গিনিপিগকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অষ্টাদশ শতকে জনপ্রিয় পোষা প্রাণী হিসেবে গিনিপিগ পরিচিতি লাভ করে।

রোগবালাইঃ ক্ষুধামন্দা, ডাইরিয়া, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, পরজীবী দ্বারা সৃষ্ট রোগ, পায়ে ক্ষত, লোম পড়ে যাওয়া ইত্যাদি এদের প্রধান রোগ। সতর্কতাঃ চকলেট, আলু, বাদাম, ও বীজ জাতীয় খাবার খাওয়ানো যাবে না। অতিরিক্ত সূর্যালোকে খাঁচা করা যাবে না। ছোট বাচ্ছাদের থেকে দূরে রাখা নিরাপদ। বৈজ্ঞানিক গবেষণাঃ মানব কল্যাণ সাধনে বিশেষতঃ শারীরিক সমস্যা দূরীকরণ, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিভিন্ন রোগ-শোক থেকে দূরে রাখার স্বার্থে কোন কিছু উদ্ভাবনে গিনিপিগের ব্যবহার রয়েছে। সেজন্যে গিনিপিগকে বিজ্ঞানীরা জীববিদ্যার বিভিন্ন গবেষণায় ব্যবহার করে আসছেন। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গিনিপিগের ব্যবহার হয়ে আসছে সপ্তদশ শতক থেকে। ইতালীয় জীববিজ্ঞানী মার্সেলো মালপিঘি এবং কার্লো ফ্রাকাসাতি শারীরবৃত্ত কাঠামো পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে সর্বপ্রথম গিনিপিগের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্ম পরিচালনা করেছেন বলে ধারনা করা হয়। ১৭৮০ সালে এন্টোনি ল্যাভোইসিয়ে তাপ উৎপাদনের একক হিসেবে ক্যালরিমিটার আবিস্কারে গিনিপিগ ব্যবহার করেছিলেন যা ছিল মোম পুড়িয়ে ফেলার মতো। উনবিংশ শতকের শেষদিকে জীবাণু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এ প্রাণীটি। লুই পাস্তুর, এমিলে রোক্স এবং রবার্ট কোচ এতে নেতৃত্ব দেন। মহাকাশ বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় এর সবিশেষ অংশগ্রহণ রয়েছে বেশ কয়েকবার। ৯ মার্চ, ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক স্পুতনিক ৯ মহাকাশ খেয়াযানের স্বার্থক উৎক্ষেপনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছে এটি। চীনও ১৯৯০ সালে যাত্রী হিসেবে গিনিপিগকে অন্তর্ভূক্ত করেছিল। বিংশ শতকের শেষদিকে পরীক্ষাগারে গিনিপিগের ব্যবহার খুবই জনপ্রিয় পন্থা হিসেবে কাজ করেছিল। ১৯৬০-এর দশকে একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারগুলোয় প্রতি বছর প্রায় ২.৫ মিলিয়ন গিনিপিগ ব্যবহার করা হয়েছিল। 

ছবি ও তথ্য – ইন্টারনেট । 

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers