সোমবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৮, , ৪ জুমাদিউল আউয়াল ১৪৩৯

শিল্প-সংস্কৃতি

দেশজ সুরে মুখরিত জাতীয় যন্ত্রসঙ্গীত উৎসবের সমাপ্তি আজ

ফারুক হোসেন শিহাব ১১ জানুয়ারি , ২০১৮, ১৮:১৩:২৬

  • দেশজ সুরে মুখরিত জাতীয় যন্ত্রসঙ্গীত উৎসবের সমাপ্তি আজ

সুরের জাদুতে আচ্ছন্ন হন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই দায়। কোমল আর নির্দয় যাই হোক না কেন প্রত্যেকেই সুরের পূজারী। বাঙালির রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অনন্য সংস্কৃতির আলোকিত গৌরব। নানা বৈচিত্র্যেঘেরা এই লোকসংস্কৃতি বাঙালিকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। যার অন্যতম হচ্ছে দেশের আনাচে কানাচে ছড়ানো ছিটানো বর্ণিল সুরের বাহার।

শুধু কণ্ঠে বা গানেই নয় বহুমাত্রিক বাদনযন্ত্রে মোহনীয় এই সুর জড়িয়ে আছে এই জাতির যাপিত জীবনে। শুনতে অবাক হওয়ার মতো যে, প্রায় ৬০০ রকমের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের। যা পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক দেশ বা জাতিরই নেই। বর্তমানে সঙ্গীতে পাশ্চাত্য যন্ত্রের অতিমাত্রিক ব্যবহার এবং দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রতি উদাসীন মনোভাবের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী এইসব বাদ্যযন্ত্র এবং যন্ত্রসঙ্গীত।

এমতাবস্থায় বাংলার বাদ্যযন্ত্র ও যন্ত্রসঙ্গীতকে রক্ষা ও মানসম্মত চর্চাসহ নতুন প্রজন্মকে আমাদের দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে আগ্রহী করে তোলার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো- ‘জাতীয় যন্ত্রসঙ্গীত উৎসব’। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের ‘নন্দন মঞ্চ’-এ নতুন বছরের প্রথমদিন থেকে শুরু হয় দশ দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য এ সঙ্গীতাসর।

পৌষের এই বিকেলে শুরু হওয়া ব্যতিক্রমী এ উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রখ্যাত গিটারশিল্পী এনামুল কবির। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সরকারি সঙ্গীত কলেজের শিক্ষক ও উৎসবের সমন্বয় কমল খালিদ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘যন্ত্রসঙ্গীত নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। বাদ্যযন্ত্র যেমন একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে; তেমনি ক্রমাগত যন্ত্রশিল্পীদের সংখ্যাও কমে আসছে। এমন সময় এত বড় আয়োজন এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করবে।’

উৎসব সম্পর্কে শিল্পকলা মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, বাঙালির প্রায় ৬শ রকমের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। বাংলার সকল বাদ্যযন্ত্র ও যন্ত্রসঙ্গীতকে রক্ষা এবং মানসম্মত চর্চাসহ নতুন প্রজন্মকে আমাদের দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে আগ্রহী করে তোলা এই উৎসবের মূল লক্ষ্য।’ 

উৎসবের উদ্বোধনী পর্বে দেশের বরেণ্য যন্ত্রশিল্পীদের একতারা, দোতারা, বাঁশিতে মহাত্মা ফকির লালন সাঁইজি’র ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ গানের সুরে সুরে যেন ইংরেজি বর্ষবরণে সবাই মেতে ওঠে ফানুশের আলোকমিছিলে। সাথে বর্ণিল আতশবজির ঝলকানিতে নবআলোয়ের উচ্ছ্বস ছড়িয়ে পড়ে উপভোগীদের প্রাণে প্রাণে। উদ্বোধনীমঞ্চে মো. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে অর্কেস্ট্রায় পরিবেশন করেন একঝাঁক প্রতিশ্রুতিশীল যন্ত্রশিল্পী। অর্কেস্ট্রা পরিবেশনা শেষে এনামুল কবির পরিবেশন করেন হাওয়াইন গিটার। পরে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে শোনান বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শিল্পীরা।

এ পর্বে এই দলটি ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গানের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত গানগুলোকে তারা অর্কেস্ট্রায় পরিবেশন করেন। অর্কেস্ট্রার পরিচালনায় ছিলেন একে আজাদ মিন্টু ও বিশ্বজিৎ সরকার। হৃদয়গ্রাহী এই পরিবেশনায় সুর আর ছন্দের উৎসবে যেন মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন রাজধানীর সুরপ্রেমীরা।

দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে সেতার পরিবেশন করবেন ফিরোজ খান, বেহালা আবরার এবং বাঁশি পরিবেশন করেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম। পাশাপাশি ছিল ছয়টি জেলার যন্ত্রশিল্পীদের মনমাতানো পরিবেশনা। ৩ জানুয়ারি সরোদ-সুরে উপভোগীদের মাতিয়ে তোলেন শাহাদাত হোসেন খান। তবলা ছিলেন স্বরূপ চক্রবর্তী এবং একোর্ডিয়ান-এ মোঃ মনির হোসেন। ৪ জানুয়ারি তবলার তালে প্রাণ জাগান জাকির হোসেন। পাশাপাশি স্বরগীত পরিবেশন করেন নাসির উদ্দীন। ৫ জানুয়ারি সারেঙ্গী পরিবেশনে প্রাণে ঢেউ জাগান মোঃ মতিয়ার। বাঁশিতে ছিলেন গাজী আব্দুল হাকিম এবং চতুরঙ্গ দীপন সরকার।

৬ জানুয়ারি সরোদ পরিবেশনায় যেন কুয়াশার শীতলবৃষ্টি নামান সরোদশিল্পী ইউসুফ খান। শিউলি ভট্টাচার্যের বেহালার বৈচিত্র্যময় সুর যেন সেই স্রোতে পুনর্বার অবগাহন করান উপভোগীদের। পাশাপাশি সত্যজিৎ চক্রবর্তীর সেতার ও সরোদ প্রশিক্ষণার্থীদের পরিবেশনায় মুখরিত ছিল শিল্পকলার নন্দনমঞ্চ। এদিন উৎসবের অংশ হিসেবে জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা ও বাঙালির বাদ্যযন্ত্র’ শীর্ষক সেমিনার। ৭ জানুয়ারি সেতার পরিবেশন করেন রিনাত ফওজিয়া, তবলায় ছিলেন সৈয়দ মেহের হোসেন, দোতারায় নির্মল কুমার দাস এবং বাঁশিতে ছিলেন জালাল আহমেদ।

গত সোমবার নিশিত দে’র সেতার পরিবেশনার পাশাপাশি এবাদুল হক সৈকতের মোহন বাঁশি দর্শক-দর্শনার্থীদের মনেও সুরের ঝড় তোলে। ৯ জানুয়ারি বাঁশিতে মুগ্ধতা ছড়ান মোঃ মনিরুজ্জামান। সারোদে ছিলেন মোঃ কামাল জাহির শামীম এবং বাঁশির প্রশিক্ষণার্থীদের হৃদয়গ্রাহী পরিবেশনা।

দোতারা, বাঁশি আর বেহালা, ঢোল, তবলা আর কাঞ্জিরা বাদনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ সুরের জাদুতে প্রতিদিন শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখেন দেশের প্রখ্যাত যন্ত্রসঙ্গীতশিল্পীরা। পল্লীসুরের এমনি প্রাণছোঁয়া জাদুতে মেতে ওঠেছে উৎসবে অংশ নেয়া সঙ্গীতপ্রেমীরা।

গতকাল ১০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি অ্যাড. আবদুল হামিদ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ায় আয়োজনের সমাপনী টানা হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। আজ সন্ধ্যায় যথারীতি আয়োজন শুরু হবে বিকেল ৫টায়। শুরুতেই পরিবেশনায় অংশ নেবেন ড. রূপসী মমতাজ। বাঁশি পরিবেশনা করবেন মুর্তজা কবির মুরাদ, সন্তর-এ থাকবেন সালাউদ্দীন শান্তনু এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী অর্কেস্টা দলের পরিবেশনায় মুখরিত হবেন সুরপ্রেমী উপভোগী হাজারো শ্রোতা-দর্শক। 

জাতীয় পর্যায়ের যন্ত্র সঙ্গীতশিল্পীদের পাশাপাশি প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলার যন্ত্র সঙ্গীতশিল্পীরা সুরের মূর্ছনায় মাতিয়ে তোলেন। আজও তার ব্যত্যয় হবে না। দশ দিনব্যাপী এ সঙ্গীতাসরে সঙ্গীত আর সুরের এমন জাদুময়তা সকল উপভোগীদের চিত্তকে যেন দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। গত দশদিন ধরে সঙ্গীতপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই তার প্রমাণ করেছে।

নিউজজি/এসএফ

পাঠকের মন্তব্য

লগইন করুন

ইউজার নেম / ইমেইল
পাসওয়ার্ড
নতুন একাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করতে এখানে ক্লিক করুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

copyright © 2016 newsg24.com | A G-Series Company
Developed by Creativeers